পবিত্র ঈদুল ফিতরের বিধি-বিধান

ছবি সংগৃহীত

 

জাওয়াদ তাহের : ইসলামী জীবনদর্শনে ঈদ শুধু আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠার দিন নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার জন্য এক বিশেষ পুরস্কার। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের ঈদ ইবাদত ও কৃতজ্ঞতার আবহে ঘেরা। ঈদের আনন্দকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করতে এর সঠিক আহকাম ও মাসআলাগুলো জানা প্রত্যেক সচেতন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

ঈদের দিনের সুন্নাহ ও প্রস্তুতি

ঈদের দিন সকালে কিছু আমল করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে মিসওয়াক করা, গোসল করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে বিজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়া সুন্নাহ। পক্ষান্তরে, ঈদুল আজহায় নামাজের আগে কিছু না খেয়ে নামাজের পর নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে আহার শুরু করা মুস্তাহাব। ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং ফেরার সময় অন্য পথ ব্যবহার করাও নবীজির (সা.) অন্যতম সুন্নত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৮৬)

ঈদের মোবারকবাদ ও শিষ্টাচার

ঈদের দিনে একে অপরকে মোবারকবাদ দেওয়া এবং আনন্দ বিনিময় করা একটি মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ঈদের দিনে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে এই দোয়া করতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম সালিহাল আ‘মাল।’ অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন। বর্তমানে আমাদের সমাজে প্রচলিত ‘ঈদ মোবারক’ বলাও মূলত বরকতের দোয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং এটি জায়েজ।

আর এই ধরনের অভিবাদন দোয়ার ব্যাপকতার মধ্যে পড়ে, কারণ যার আমল কবুল হয়ে গেছে, তার জন্য সময়টি বরকতময়। তবে মনে রাখতে হবে, ‘ঈদ মোবারক’ বলা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই এটিকে আবশ্যক মনে করা কিংবা কেউ না বললে তার ওপর রাগান্বিত হওয়া সঠিক নয়। (ফাতাওয়া শামি : ২/১৬৯)
ঈদের নামাজ আদায়ের সর্বোত্তম স্থান

রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খুলাফায়ে রাশিদিনের আমল থেকে প্রমাণিত যে ঈদের নামাজ বড় ঈদগাহ বা খোলা মাঠে আদায় করা সুন্নত। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) দুই ঈদের দিন নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৬৫), আলী (রা.) একে সুন্নাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (আল-মুজামুল আওসাত, তবারানি, হাদিস : ৪০৪০)

তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা বৃষ্টি হলে মসজিদে নামাজ পড়া জায়েজ। একবার ঈদের দিন বৃষ্টি হওয়ায় নবীজি (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৫৬)

বর্তমানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মসজিদে জামাত করা হলে তা সুন্নতের খেলাফ হবে না। তবে বিনা ওজরে খোলা মাঠ ত্যাগ করা অনুচিত।

ঈদের নামাজের আগে-পরে নফল নামাজ

ঈদের নামাজের আগে বা পরে ঈদগাহে কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। এমনকি বাড়িতেও ঈদের নামাজের আগে কোনো নফল নামাজ নেই। তবে ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে এসে চার রাকাত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। (ইলাউস সুনান : ৮/১৩৪)

ঈদের নামাজের নিয়ত

ঈদের নামাজ বা যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরের ইচ্ছা বা সংকল্পই নিয়ত হিসেবে গণ্য। মুখে আরবি বা বাংলা নিয়ত উচ্চারণ করা জরুরি নয়। তবে মনের স্থিরতার জন্য কেউ যদি মুখে নিজ মাতৃভাষায় নিয়ত করে, তাতে কোনো বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে তাকবির সংখ্যা বা কিবলামুখী হওয়ার মতো দীর্ঘ বাক্য বলার প্রয়োজন নেই; শুধু ‘এই ইমামের পেছনে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করছি’—এতটুকু নিয়ত করলেই যথেষ্ট। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৪১৫)

নামাজে ভুল ও সাহু সিজদা

ঈদের নামাজে যদি কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় এবং মুসল্লিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকে, তবে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে। কিন্তু ঈদের বড় জামাতে যদি সিজদায়ে সাহু দিতে গেলে মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার বা হুড়াহুড়ি হওয়ার ভয় থাকে, তবে ফকিহদের মতে সিজদায়ে সাহু মাফ হয়ে যাবে। ইমাম স্বাভাবিকভাবেই নামাজ শেষ করবেন। (আল-মুহিতুল বুরহানি : ২/৫০১)

ঈদের খুতবার আদব ও তাকবির

ঈদের নামাজের পর খুতবা প্রদান করা সুন্নত। প্রথম খুতবার শুরুতে ৯ বার এবং দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে সাতবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলা মুস্তাহাব। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক : ৩/২৯০)

খুতবা চলাকালীন মুসল্লিদের জন্য চুপ থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব। ইমাম যখন তাকবির বলবেন, মুসল্লিরা মনে মনে বললেও উচ্চৈঃস্বরে বা মুখে তাকবির বলবেন না; বরং পূর্ণ নীরবতা পালন করবেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫৬৪২)

ঈদ ও জুমা একই দিনে হলে করণীয়

যদি ঈদের দিন জুমাবার হয়, তবে ঈদ ও জুমা উভয়টিই আলাদাভাবে আদায় করতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন ঈদের নামাজ পড়লে জুমা লাগে না, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ঈদের নামাজ ওয়াজিব এবং জুমা ফরজ; একটির দ্বারা অন্যটির দায় মুক্তি হয় না। বিশ্বনবী (সা.) এমন দিনে উভয় নামাজই নিজে আদায় করেছেন এবং সাহাবিদের পড়িয়েছেন।(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৭৮)

নারীদের ঈদের জামাতে উপস্থিতি

ঈদের নামাজ নারীদের ওপর ওয়াজিব নয়। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের যুগে নারীদের ঈদগাহে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ করা হতো। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও জুবাইর (রা.) তাঁদের পরিবারের নারীদের ঈদগাহে যেতে দিতেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ৫৮৪৬)

ফকিহদের মতে, ফিতনার আশঙ্কা এবং শরয়ি বাধ্যবাধকতা না থাকায় নারীদের ঘরে থাকাই শ্রেয়।

নামাজের রাকাত ছুটে গেলে (মাসবুক) করণীয়

ঈদের নামাজে যদি কারো প্রথম রাকাত ছুটে যায়, তবে সে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে প্রথমে সানা, আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়বে। এরপর সুরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা পাঠ করবে। কিরাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির বলবে এবং রুকু করে বাকি নামাজ পূর্ণ করবে। তবে মুফতি ওয়ালি হাসান (রহ.)-এর মতে, কেউ যদি সাধারণ নামাজের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে প্রথমে সানা পড়ে, তারপর তাকবিরগুলো বলে এবং এরপর কিরাত পড়ে রুকুতে যায়, তবে সেটিরও অবকাশ রয়েছে। এ ছাড়া কেউ যদি রুকুতে থাকা অবস্থায় ইমামের সঙ্গে শরিক হয়, তবে তাকবিরগুলো বলে রুকু পাওয়ার আশা থাকলে দাঁড়িয়ে বলবে, অন্যথায় রুকুতে গিয়ে তাসবিহের বদলে তাকবিরগুলো বলে নেবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ২১৭৩; হিন্দিয়া : ১/১৫১)

ভিন্ন দেশে ঈদ করে স্বদেশে ফেরা

যদি কেউ সৌদি আরব বা অন্য দেশে ঈদ করার পর ওই দিনই বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এখানে পরের দিন ঈদের জামাত পান, তবে তাঁর জন্য আবার ঈদের নামাজ পড়া আবশ্যক নয়। তবে যদি তিনি ব্যক্তিগতভাবে শরিক হতে চান, তাতে বাধা নেই। (ফাতাওয়া সিরাজিয়া : ১১০)

ঈদের নামাজ শেষে মুসাফাহা ও মুয়ানাকা

নামাজ শেষ করে একে অপরের সঙ্গে মুসাফাহা (করমর্দন) বা মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করাকে নামাজের অংশ বা বিশেষ সুন্নত মনে করা ঠিক নয়। তবে যদি দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ বা নতুন সাক্ষাতের কারণে কেউ এটি করে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু এটিকে ঈদের দিনের বিশেষ ইবাদত বা ‘নামাজ-পরবর্তী আবশ্যক আমল’ মনে করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৮১)

আমাদের মনে রাখতে হবে ঈদের ইবাদত এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর আদেশের পূর্ণ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। নামাজের স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে খুতবা শোনা ও সামাজিক শিষ্টাচার পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহর অনুসরণই মুমিনের কাম্য। আমরা যদি সঠিক মাসআলা অনুযায়ী বিভ্রান্তি এড়িয়ে এই ইবাদতগুলো পালন করি, তবেই আমাদের ঈদ হবে অর্থবহ ও বরকতময়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।

সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে যা যা চেক করা জরুরি

» কবজি ব্যথা: কারণ ও করণীয়

» বার কাউন্সিল পরীক্ষায় ববির ৪০ শিক্ষার্থীর সাফল্য

» আগামীতে আপনাদের সাথে কাজের মাধ্যমে দেখা হবে: ডেপুটি স্পিকার

» যে কারণে ইরানের সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে হামলা এক ভয়াবহ মোড়: দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

» ঈদের দিন সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস

» ২১ ঘণ্টা পর উত্তরের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

» কোস্ট গার্ডের অভিযানে ২ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজা জব্দ

» শাহবাগের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় হত্যার ঘটনায় আরো চারজন গ্রেপ্তার

» পদ্মা সেতুতে একদিনে টোল আদায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

পবিত্র ঈদুল ফিতরের বিধি-বিধান

ছবি সংগৃহীত

 

জাওয়াদ তাহের : ইসলামী জীবনদর্শনে ঈদ শুধু আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠার দিন নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার জন্য এক বিশেষ পুরস্কার। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের ঈদ ইবাদত ও কৃতজ্ঞতার আবহে ঘেরা। ঈদের আনন্দকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করতে এর সঠিক আহকাম ও মাসআলাগুলো জানা প্রত্যেক সচেতন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

ঈদের দিনের সুন্নাহ ও প্রস্তুতি

ঈদের দিন সকালে কিছু আমল করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে মিসওয়াক করা, গোসল করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে বিজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়া সুন্নাহ। পক্ষান্তরে, ঈদুল আজহায় নামাজের আগে কিছু না খেয়ে নামাজের পর নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে আহার শুরু করা মুস্তাহাব। ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং ফেরার সময় অন্য পথ ব্যবহার করাও নবীজির (সা.) অন্যতম সুন্নত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৮৬)

ঈদের মোবারকবাদ ও শিষ্টাচার

ঈদের দিনে একে অপরকে মোবারকবাদ দেওয়া এবং আনন্দ বিনিময় করা একটি মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ঈদের দিনে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে এই দোয়া করতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম সালিহাল আ‘মাল।’ অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন। বর্তমানে আমাদের সমাজে প্রচলিত ‘ঈদ মোবারক’ বলাও মূলত বরকতের দোয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং এটি জায়েজ।

আর এই ধরনের অভিবাদন দোয়ার ব্যাপকতার মধ্যে পড়ে, কারণ যার আমল কবুল হয়ে গেছে, তার জন্য সময়টি বরকতময়। তবে মনে রাখতে হবে, ‘ঈদ মোবারক’ বলা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই এটিকে আবশ্যক মনে করা কিংবা কেউ না বললে তার ওপর রাগান্বিত হওয়া সঠিক নয়। (ফাতাওয়া শামি : ২/১৬৯)
ঈদের নামাজ আদায়ের সর্বোত্তম স্থান

রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খুলাফায়ে রাশিদিনের আমল থেকে প্রমাণিত যে ঈদের নামাজ বড় ঈদগাহ বা খোলা মাঠে আদায় করা সুন্নত। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) দুই ঈদের দিন নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৬৫), আলী (রা.) একে সুন্নাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (আল-মুজামুল আওসাত, তবারানি, হাদিস : ৪০৪০)

তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা বৃষ্টি হলে মসজিদে নামাজ পড়া জায়েজ। একবার ঈদের দিন বৃষ্টি হওয়ায় নবীজি (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৫৬)

বর্তমানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মসজিদে জামাত করা হলে তা সুন্নতের খেলাফ হবে না। তবে বিনা ওজরে খোলা মাঠ ত্যাগ করা অনুচিত।

ঈদের নামাজের আগে-পরে নফল নামাজ

ঈদের নামাজের আগে বা পরে ঈদগাহে কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। এমনকি বাড়িতেও ঈদের নামাজের আগে কোনো নফল নামাজ নেই। তবে ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে এসে চার রাকাত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। (ইলাউস সুনান : ৮/১৩৪)

ঈদের নামাজের নিয়ত

ঈদের নামাজ বা যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরের ইচ্ছা বা সংকল্পই নিয়ত হিসেবে গণ্য। মুখে আরবি বা বাংলা নিয়ত উচ্চারণ করা জরুরি নয়। তবে মনের স্থিরতার জন্য কেউ যদি মুখে নিজ মাতৃভাষায় নিয়ত করে, তাতে কোনো বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে তাকবির সংখ্যা বা কিবলামুখী হওয়ার মতো দীর্ঘ বাক্য বলার প্রয়োজন নেই; শুধু ‘এই ইমামের পেছনে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করছি’—এতটুকু নিয়ত করলেই যথেষ্ট। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৪১৫)

নামাজে ভুল ও সাহু সিজদা

ঈদের নামাজে যদি কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় এবং মুসল্লিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকে, তবে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে। কিন্তু ঈদের বড় জামাতে যদি সিজদায়ে সাহু দিতে গেলে মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার বা হুড়াহুড়ি হওয়ার ভয় থাকে, তবে ফকিহদের মতে সিজদায়ে সাহু মাফ হয়ে যাবে। ইমাম স্বাভাবিকভাবেই নামাজ শেষ করবেন। (আল-মুহিতুল বুরহানি : ২/৫০১)

ঈদের খুতবার আদব ও তাকবির

ঈদের নামাজের পর খুতবা প্রদান করা সুন্নত। প্রথম খুতবার শুরুতে ৯ বার এবং দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে সাতবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলা মুস্তাহাব। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক : ৩/২৯০)

খুতবা চলাকালীন মুসল্লিদের জন্য চুপ থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব। ইমাম যখন তাকবির বলবেন, মুসল্লিরা মনে মনে বললেও উচ্চৈঃস্বরে বা মুখে তাকবির বলবেন না; বরং পূর্ণ নীরবতা পালন করবেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫৬৪২)

ঈদ ও জুমা একই দিনে হলে করণীয়

যদি ঈদের দিন জুমাবার হয়, তবে ঈদ ও জুমা উভয়টিই আলাদাভাবে আদায় করতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন ঈদের নামাজ পড়লে জুমা লাগে না, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ঈদের নামাজ ওয়াজিব এবং জুমা ফরজ; একটির দ্বারা অন্যটির দায় মুক্তি হয় না। বিশ্বনবী (সা.) এমন দিনে উভয় নামাজই নিজে আদায় করেছেন এবং সাহাবিদের পড়িয়েছেন।(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৭৮)

নারীদের ঈদের জামাতে উপস্থিতি

ঈদের নামাজ নারীদের ওপর ওয়াজিব নয়। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের যুগে নারীদের ঈদগাহে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ করা হতো। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও জুবাইর (রা.) তাঁদের পরিবারের নারীদের ঈদগাহে যেতে দিতেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ৫৮৪৬)

ফকিহদের মতে, ফিতনার আশঙ্কা এবং শরয়ি বাধ্যবাধকতা না থাকায় নারীদের ঘরে থাকাই শ্রেয়।

নামাজের রাকাত ছুটে গেলে (মাসবুক) করণীয়

ঈদের নামাজে যদি কারো প্রথম রাকাত ছুটে যায়, তবে সে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে প্রথমে সানা, আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়বে। এরপর সুরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা পাঠ করবে। কিরাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির বলবে এবং রুকু করে বাকি নামাজ পূর্ণ করবে। তবে মুফতি ওয়ালি হাসান (রহ.)-এর মতে, কেউ যদি সাধারণ নামাজের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে প্রথমে সানা পড়ে, তারপর তাকবিরগুলো বলে এবং এরপর কিরাত পড়ে রুকুতে যায়, তবে সেটিরও অবকাশ রয়েছে। এ ছাড়া কেউ যদি রুকুতে থাকা অবস্থায় ইমামের সঙ্গে শরিক হয়, তবে তাকবিরগুলো বলে রুকু পাওয়ার আশা থাকলে দাঁড়িয়ে বলবে, অন্যথায় রুকুতে গিয়ে তাসবিহের বদলে তাকবিরগুলো বলে নেবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ২১৭৩; হিন্দিয়া : ১/১৫১)

ভিন্ন দেশে ঈদ করে স্বদেশে ফেরা

যদি কেউ সৌদি আরব বা অন্য দেশে ঈদ করার পর ওই দিনই বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এখানে পরের দিন ঈদের জামাত পান, তবে তাঁর জন্য আবার ঈদের নামাজ পড়া আবশ্যক নয়। তবে যদি তিনি ব্যক্তিগতভাবে শরিক হতে চান, তাতে বাধা নেই। (ফাতাওয়া সিরাজিয়া : ১১০)

ঈদের নামাজ শেষে মুসাফাহা ও মুয়ানাকা

নামাজ শেষ করে একে অপরের সঙ্গে মুসাফাহা (করমর্দন) বা মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করাকে নামাজের অংশ বা বিশেষ সুন্নত মনে করা ঠিক নয়। তবে যদি দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ বা নতুন সাক্ষাতের কারণে কেউ এটি করে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু এটিকে ঈদের দিনের বিশেষ ইবাদত বা ‘নামাজ-পরবর্তী আবশ্যক আমল’ মনে করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৮১)

আমাদের মনে রাখতে হবে ঈদের ইবাদত এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর আদেশের পূর্ণ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। নামাজের স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে খুতবা শোনা ও সামাজিক শিষ্টাচার পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহর অনুসরণই মুমিনের কাম্য। আমরা যদি সঠিক মাসআলা অনুযায়ী বিভ্রান্তি এড়িয়ে এই ইবাদতগুলো পালন করি, তবেই আমাদের ঈদ হবে অর্থবহ ও বরকতময়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।

সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com